বিশ্বের ১৬৭টি দেশে ছড়িয়ে রয়েছেন প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী। তাঁদের ঘামঝরানো উপার্জনে অর্জিত রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। অথচ সম্ভাবনা ও সরকারি সুযোগ থাকার পরও অভিবাসনে পিছিয়ে রয়েছে নীলফামারী জেলা।
প্রতি বছর এই জেলা থেকে প্রায় ৩ লাখ কর্মীর বিদেশে যাওয়ার সুযোগ বা কোটা থাকলেও বাস্তবে পাড়ি জমাচ্ছেন মাত্র ৩৫ হাজার মানুষ। সঠিক তথ্যের অভাব, কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি এবং দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে এই বিপুল সম্ভাবনা হাতছাড়া হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নীলফামারী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘দক্ষতা উন্নয়ন ও নিরাপদ অভিবাসন’ শীর্ষক এক সেমিনারে এই হতাশাজনক চিত্র উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মনজুরুল হক জানান, চলতি বছর (৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) জেলা থেকে প্রবাসে যাওয়ার জন্য মাত্র ১ হাজার ২৯৫ জন নাম নিবন্ধন করেছেন, যার মধ্যে নারী মাত্র ২০০ জন।
এই বিশাল ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে স্থানীয় দালালচক্র। সরকারি সুব্যবস্থা না নিয়ে অনেক সাধারণ মানুষ দালালদের প্রলোভনে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। ইতোমধ্যে জেলায় দালালচক্র সংক্রান্ত ৩৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে ১৫টি নিষ্পত্তি করেছে কর্তৃপক্ষ। তিনি আরও জানান, বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গিয়ে কেউ প্রতারিত বা হয়রানির শিকার হলে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বা কাজের নিশ্চয়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জোর দিয়ে বলেন, “দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। কাজ ও ভাষা শিখে বিদেশে গেলে শ্রমিকরা যেমন ভালো বেতন পাবেন, তেমনি দেশেও বেশি রেমিট্যান্স আসবে। দালালদের খপ্পরে না পড়ে বৈধ ও ঝুঁকিমুক্ত পথে বিদেশে যাওয়া উচিত, নয়তো পুরো পরিবারকে চরম অনিশ্চয়তায় পড়তে হয়।” নীলফামারীর মানুষকে দালালমুক্ত সেবা দিতে জেলায় বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির শাখা কার্যালয় চালুর ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনার আশ্বাস দেন তিনি।
টিটিসির অধ্যক্ষ মো. মাসুদ রানার সভাপতিত্বে সেমিনারে জানানো হয়, নীলফামারী টিটিসিতে কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষার ওপর আধুনিক প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা রয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মীরা বিদেশে গিয়ে কাজের ভালো পরিবেশের পাশাপাশি উচ্চ বেতন পেয়ে থাকেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে বিদেশে গমনেচ্ছু ১৩০ জন কর্মীকে (১০০ জন পুরুষ ও ৩০ জন নারী) ৩ দিনব্যাপী বিশেষ দিকনির্দেশনামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যা শেষে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পন্ন করে তারা প্রবাসে পাড়ি জমাবেন।
টিটিসির ইনস্ট্রাক্টর (মেকানিক্যাল) শরিফুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) ফজলুর রহমান মোহসিন। এছাড়া বক্তব্য দেন প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক নীলফামারী শাখার ব্যবস্থাপক নুর জাহান বেগম এবং মালয়েশিয়া প্রবাসী সবুজ খন্দকার।
বক্তারা নীলফামারীর প্রবাসপ্রত্যাশীদের দালালদের মিষ্টি কথায় না ভুলতে এবং সরকারি টিটিসির মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে বৈধ পথে প্রবাসে যাওয়ার আহ্বান জানান।
