আজ ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস। ‘একটি ডাক নেটওয়ার্ক, অসীম সম্ভাবনা’—এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। চিঠি ও পার্সেল আদান-প্রদানের ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত, সাশ্রয়ী ও জনবান্ধব সেবায় রূপান্তরের গুরুত্ব এবারের দিবসে বিশেষভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ডাক অধিদপ্তর ৯ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডাকসেবা সপ্তাহ পালন করছে। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি উৎসব, ডাকটিকিট প্রদর্শনী ও ডাকসেবা মেলার আয়োজনের কথা রয়েছে। একই সঙ্গে ই-কমার্স, লজিস্টিকস, পার্সেল পরিবহন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং গ্রাহকের দোরগোড়ায় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সেবা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ডাক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহনের পরিমাণ ছিল ২৪৩ টন, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের একই সময়ে বেড়ে ৩১৬ টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ভেতরে ও প্রবাসে থাকা ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটারের ডাকযোগে ভোটাধিকার প্রয়োগেও ডাক বিভাগের ভূমিকা ছিল।
আইন ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান :
বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান আইনি ভিত্তি হলো The Post Office Act, 1898 এবং এর সংশোধনী। ২০১০ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ডাকসেবার পরিধি ও বেসরকারি মেইলিং অপারেটর এবং কুরিয়ার সেবার লাইসেন্সসংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আইনের ৪এ ধারায় বাংলাদেশ ডাকঘরকে দেশের সর্বত্র ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সার্বজনীন ডাকসেবা প্রদানের জন্য মনোনীত জাতীয় ডাকসেবা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ধারায় জনস্বার্থে নতুন প্রযুক্তি ও সেবা চালু এবং ডাকসেবা সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, ৪বি ধারায় মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সেবা পরিচালনার জন্য লাইসেন্সের বিধান রয়েছে।
আইনের ৭ ধারায় সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ডাকমাশুল নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখা হয়েছে। ২০ ধারায় অশ্লীল, হুমকিমূলক বা গুরুতর আপত্তিকর বিষয়বস্তু ডাকযোগে পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ ছাড়া ২১ ধারায় ডাকযোগে প্রেরণযোগ্য সামগ্রী, প্রেরণের শর্ত এবং ডাকসামগ্রী গ্রহণ ও সরবরাহের নিয়ম নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
এসব বিধিবিধানের উদ্দেশ্য হলো ডাকসেবার শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং নিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম নিশ্চিত করা। তবে সেবার মান, বিলম্ব, পার্সেল হারানো কিংবা গ্রাহকের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেবার শর্ত ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী প্রতিকার পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিকায়নে বাড়ছে প্রত্যাশা
বিশ্ব ডাক দিবসের সূচনা ১৯৬৯ সালে জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের (ইউপিইউ) কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। ১৮৭৪ সালের ৯ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের বার্নে ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার দিনটিকে স্মরণ করেই প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়।
ডিজিটাল যোগাযোগের প্রসার সত্ত্বেও সরকারি চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ নথি, পার্সেল, ই-কমার্স পণ্য এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দিতে ডাকব্যবস্থার গুরুত্ব রয়েছে। তাই শুধু নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করাই নয়, সময়মতো চিঠি ও পার্সেল পৌঁছানো, সেবার খরচ যৌক্তিক রাখা, গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সেবার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশ্ব ডাক দিবসের প্রত্যাশা—রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান মেনে প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক ডাকব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এতে শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ব্যবধান কমবে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পণ্য বাজারজাতকরণে সুবিধা পাবেন এবং সরকারি ডাকসেবা সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
