ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৮ অক্টোবর ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মাদ্রাসা শিক্ষা: বিতর্কের আড়ালে যে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা মতামত

হাফিজ মাওলানা ফখর উদ্দিন
অক্টোবর ৮, ২০২৬ ৭:১৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মাদ্রাসা শিক্ষা আমাদের সমাজ, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুগের পর যুগ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য আলেম, শিক্ষক, ইমাম, খতিব ও সমাজসেবক গড়ে উঠেছেন। ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মানুষের নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ তৈরিতেও তাঁদের অনেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যক্তির বিতর্কিত, অনৈতিক কিংবা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ও আলেম সমাজকে নিয়ে কটূক্তি ও নেতিবাচক সাধারণীকরণের প্রবণতা চোখে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো একজন ধর্মীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই কখনো কখনো সেই অভিযোগের দায় টেনে নেওয়া হচ্ছে সব আলেম, সব মাদ্রাসা শিক্ষক কিংবা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর।

প্রশ্ন হলো—এমন সাধারণীকরণ কি ন্যায়সংগত?

অপরাধ ব্যক্তির, প্রতিষ্ঠানের নয়ঃ

একজন চিকিৎসক অপরাধ করলে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় না। কোনো শিক্ষক অন্যায় করলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে অপরাধী বলা হয় না। একজন ব্যবসায়ী প্রতারণা করলে পৃথিবীর সব ব্যবসায়ীকে প্রতারক বলা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি কোনো মাদ্রাসাশিক্ষিত ব্যক্তি বা ধর্মীয় বক্তার অপরাধের দায় হাজার হাজার নির্দোষ আলেম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ন্যায়বিচারের সঙ্গে যায় না।

অপরাধী যে-ই হোক, তাঁর পরিচয় যা-ই হোক—অপরাধ প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। ধর্মীয় পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না; একইভাবে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ সমালোচনার ঊর্ধ্বেও নন।

কিন্তু ব্যক্তির অপরাধকে সামষ্টিক অপরাধে পরিণত করা ন্যায়বিচারের ধারণার পরিপন্থী।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে—“কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” (সূরা আল-আন‘আম, আয়াত ১৬৪)। এই বাণীর মধ্যে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার যে মৌলিক শিক্ষা রয়েছে, তা আমাদের সামাজিক বিচারবোধের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। একজনের অন্যায়ের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত হতে পারে না।

মাদ্রাসা কি কেবল ধর্মীয় শিক্ষা দেয়?ঃ

মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বিতর্কের সময় একটি বিষয় প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়—প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য মানুষকে নৈতিক ও মানবিক করে তোলা।

কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা, ইসলামের ইতিহাস ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি, শিষ্টাচার, আত্মসংযম ও মানবিকতার শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ইসলামের প্রথম প্রত্যাদেশের সূচনাই হয়েছে জ্ঞানার্জনের আহ্বান দিয়ে—“পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-আলাক, আয়াত ১)। জ্ঞানচর্চা তাই ইসলামের মৌলিক শিক্ষারই অংশ।

আমাদের সমাজের অসংখ্য মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসায় হাজার হাজার শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অনেকে নীরবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা বিস্তারে কাজ করছেন। তাঁদের সেই অবদান হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন আলোচিত বা ভাইরাল হয় না; কিন্তু সমাজের নৈতিক কাঠামো গঠনে তার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কথা বলতে হবেঃ

মাদ্রাসা শিক্ষা বা আলেম সমাজের মর্যাদা রক্ষার অর্থ কোনো অপরাধীকে রক্ষা করা নয়। বরং ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি মানুষের বিশ্বাসের সুযোগ নেন, প্রতারণা করেন, অর্থ আত্মসাৎ করেন, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ান কিংবা অন্য কোনো অপরাধ করেন—তাঁর বিরুদ্ধে অবশ্যই কথা বলতে হবে।

কেউ দাড়ি, টুপি, পাগড়ি বা ধর্মীয় পোশাক পরেছেন বলেই তিনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। আবার কারও ধর্মীয় পোশাক বা পরিচয় আছে বলেই তাঁকে অপরাধী ধরে নেওয়াও ন্যায়সংগত নয়।

মানুষকে পোশাক দিয়ে নয়, তাঁর চরিত্র ও কর্ম দিয়ে বিচার করাই যুক্তিসংগত।

কোনো অভিযোগ উঠলে প্রয়োজন সুষ্ঠু তদন্ত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজন আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সমালোচনা হোক, কটূক্তি নয়ঃ

মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় সমস্যা থাকলে তা নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হতে পারে। বরং গঠনমূলক সমালোচনা একটি প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করে।

শিক্ষার মান, আধুনিক পাঠ্যক্রম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা, কর্মমুখী দক্ষতা, শিশু সুরক্ষা, আর্থিক স্বচ্ছতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি—এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলা কোনো বিদ্বেষ নয়। বরং প্রয়োজনীয় আত্মসমালোচনার অংশ।

তবে গঠনমূলক সমালোচনা এবং বিদ্বেষপূর্ণ কটূক্তি এক বিষয় নয়।

কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান দাবি করা সমালোচনা; কিন্তু কয়েকজনের কর্মকাণ্ডের কারণে ‘সব হুজুর ভণ্ড’ কিংবা ‘সব মাদ্রাসা খারাপ’ বলে দেওয়া অযৌক্তিক সাধারণীকরণ।

কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে লাখো মানুষের চরিত্র নির্ধারণ করা যুক্তিবাদী সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

আত্মসমালোচনার দরজাও খোলা রাখতে হবে
মাদ্রাসা শিক্ষার পক্ষে কথা বলার অর্থ মাদ্রাসার সবকিছুকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করা নয়। বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সততা, ন্যায়বিচার, আমানতদারি ও আদর্শের উচ্চতর মান প্রত্যাশা করে।

কোথাও অন্যায়, অনিয়ম, নির্যাতন, আর্থিক অসচ্ছতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে পরিচয়ের আড়ালে না রেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

একই সঙ্গে সময়ের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। আমরা এমন মাদ্রাসা শিক্ষা চাই, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ধর্মীয় মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও পেশাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও সক্ষম হয়ে উঠবে।

একটি পচা ফলের দায় পুরো বাগানের নয়ঃ

সমাজে ভালো-মন্দ মানুষ সব পেশা ও শ্রেণিতেই আছেন। শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব—কোনো শ্রেণিই এর ব্যতিক্রম নয়।
তাই একজন মানুষের ভুল বা অপরাধ দিয়ে পুরো শ্রেণিকে বিচার করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

একটি গাছে একটি পচা ফল পাওয়া গেলে সেটি সরিয়ে ফেলতে হয়; একটি পচা ফলের কারণে পুরো বাগানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।

একইভাবে কিছু ভণ্ড বা অপরাধীর কারণে শত বছরের ধর্মীয় শিক্ষার ঐতিহ্য, অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এবং লাখ লাখ নির্দোষ শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে অপমান করা উচিত নয়।
অন্ধ সমর্থন নয়, অন্ধ বিরোধিতাও নয়
আমাদের প্রয়োজন অন্ধ সমর্থন নয়, আবার অন্ধ বিরোধিতাও নয়। প্রয়োজন ন্যায়সংগত, যুক্তিনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।

ভণ্ডামির প্রতিবাদ অবশ্যই হোক। ধর্মের নামে প্রতারণার বিরুদ্ধে সমাজ সোচ্চার হোক। অপরাধী হুজুর হোন, শিক্ষক হোন কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের মানুষ—অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁর বিচার হোক অপরাধের ভিত্তিতে।

কিন্তু সেই প্রতিবাদের নামে মাদ্রাসা শিক্ষা, ইসলামি মূল্যবোধ কিংবা পুরো আলেম সমাজকে কটূক্তি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আমরা যেন অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর হতে গিয়ে নির্দোষের প্রতি অন্যায় না করি। ভণ্ডামির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে গিয়ে যেন একটি সম্মানজনক শিক্ষাব্যবস্থা ও তার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের প্রতি অবিচার না করি।

কারণ একটি সুস্থ সমাজ বিদ্বেষ, অবমাননা কিংবা সামষ্টিক অপমানের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে না। সে সমাজের ভিত্তি হয় জ্ঞান, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, আত্মসমালোচনা ও পারস্পরিক সম্মান।

অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হোক বিচারের মানদণ্ড। আর সমালোচনার ভাষায় থাকুক সত্য, যুক্তি ও মানবিকতার সংযম।

লেখক পরিচিতি : হাফিজ মাওলানা ফখর উদ্দিন,
শাহপরান উপশহর আ/এ, খাদিমনগর, শাহপরান, সিলেট।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।