আজকাল যেন চারপাশে তাকালেই একটি প্রশ্ন বারবার মনে আসে—আমরা কি সত্যিই সুস্থ আছি?
নিজের শরীরের খোঁজ নিতে গিয়েই বুঝি, আমি নিজেও বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ। তারপর মায়ের কথা মনে হয়—তিনিও অসুস্থ। নানুর কাছে ফোন দিলে শোনা যায়, তাঁর শরীরও ভালো নেই। শাশুড়ির খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, তিনিও কোনো না কোনো শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা পরিচিত মানুষ—যার সঙ্গেই কথা হয়, খুব কম মানুষকেই সত্যিকার অর্থে সুস্থ ও প্রাণবন্ত মনে হয়।
কেউ ডায়াবেটিসে ভুগছেন, কেউ উচ্চ রক্তচাপে, কেউ হৃদ্রোগে। কারও ঘুম নেই, কারও মানসিক শান্তি নেই। কেউ সারাক্ষণ ক্লান্তিতে ভোগেন, কেউ দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগকে সঙ্গী করে বেঁচে আছেন। যেন আমাদের চারপাশে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে একটি অসুস্থ সমাজের নীরব বাস্তবতা।
প্রশ্ন হলো—এত আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা, এত উন্নত প্রযুক্তি, এত স্বাস্থ্যসচেতনতার কথা বলার পরও মানুষ কেন এত অসুস্থ?
এর উত্তর হয়তো একটিমাত্র কারণে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের খাদ্যাভ্যাসে এসেছে বড় পরিবর্তন। বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাবারের অভাব, ভেজাল ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্য নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। অন্যদিকে কর্মব্যস্ত জীবনে নিয়মিত ঘুম, শরীরচর্চা ও বিশ্রাম যেন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটে চলা মানুষ নিজের শরীরের কথা ভাবার সময়ই পাচ্ছে না।
এর সঙ্গে রয়েছে পরিবেশ দূষণ, শব্দদূষণ, মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক প্রতিযোগিতার চাপ। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আমাদের শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দিয়েছে এবং মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে। আমরা সবসময় সংযুক্ত, কিন্তু যেন ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি—নিজের শরীর থেকে, নিজের মন থেকে, এমনকি প্রকৃতির কাছ থেকেও।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আজকাল কাউকে জিজ্ঞেস করলে—“কেমন আছেন?”—খুব কমই শোনা যায়, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।” বরং উত্তর আসে, “এই তো, শরীরটা ভালো না।”
হয়তো আমরা উন্নয়নের পথে অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু সুস্থতার পথে কতটা এগিয়েছি—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
দিন শেষে তাই মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো অর্থ-বিত্ত, বাড়ি কিংবা সামাজিক অবস্থান নয়। একটি সুস্থ শরীর, একটি শান্ত মন, গভীর ঘুম এবং প্রিয়জনদের সুস্থ দেখতে পাওয়াই হয়তো আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আমাদের থামতে হবে। নিজেদের দিকে একটু ফিরে তাকাতে হবে। খাবার, ঘুম, বিশ্রাম, শরীরচর্চা এবং মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ অসুস্থ হয়ে পড়ার পরই আমরা সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করি—
সুস্থ থাকাটা কোনো সাধারণ বিষয় নয়; সুস্থতাই জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত।
আসুন, আমরা শুধু দীর্ঘ জীবন নয়—সুস্থ, সচেতন ও শান্ত একটি জীবনের জন্যও ভাবি।
