জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
১৭ নভেম্বর দুপুরে এই রায় ঘোষণা করা হয়। আদালতের এই রায়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইঞ্জিনিয়ার মুমিনুল হকের সুযোগ্য সন্তান ও তরুণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মোস্তফা কামাল সুমন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ভয়াবহ রাজনৈতিক হয়রানির বিবরণ তুলে ধরে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন।
মোস্তফা কামাল সুমনের ফেসবুকের স্ট্যাটাসটি সম্পূর্ণ তুলে ধরা হলো:
আজ ১৭ নভেম্বর!
অজানা শংকায় আতংকিত হওয়ার দিন। আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো জানি না। চোখ বাঁধা, হাতে হ্যান্ডকাপ! চারপাশে ঘিরে থাকা অপরিচিত মানুষদের কন্ঠে আমার প্রতি নানান অভিযোগ! পুলিশ পিটানো, দাঁত ভেঙে দেয়া, পুলিশের উপর আক্রমন, বিচারপতির বাসভবনে হামলা, ডিবি অফিসে আক্রমন ইত্যাদি নানান প্রশ্নবানে জর্জরিত করা হয়েছে! সময় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা নেই, তবে পুরো একদিন আমি অন্ধকারে ছিলাম এটা নিশ্চিত!
আমাকে প্রথম যখন চোখ খোলা হয়, তখন আমি নিজেকে আবিষ্কার করি মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে! ডিবি পুলিশের এডিসি সাহেব মুচকি হাসলেন। বললেনঃ কেমন আছেন? ব্যক্তিগর আরও অনেক প্রশ্ন। অনেকক্ষন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আমাকে আবার কালো কাপড়ে ঢেকে বলা হলো, উনাকে জায়গা মতো নিয়ে যাও! আবার অনেকক্ষন অপেক্ষা!
এডিসি সাহেব কোন কাজে বাহিরে গিয়েছেন! ফিরে আসলেন আনুমানিক বিকালের দিকে। এসে বললেন, আপনাকে ছেড়ে দিবো! শুধু আমাদের একটা কাজ করে দিতে হবে! আমি জানতে চাইলাম কি কাজ? তিনি বললেনঃ আপনার বাবাকে আগামি নির্বাচনের জন্য রাজি করাতে হবে! আপনার সামনে দুটি পথ! হয় আপনি আমাদের চাওয়া পুরন করবেন, অথবা আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবো!
ভয় ডর কেটে গেছে প্রথম চোখ বাঁধাতেই! আমি বললামঃ আমাকে যদি একশত বারও জিবিত করে হত্যা করা হয়, আমি ৯৯তম জিবনেও হাসিনার সাথে আপোষ করবো না। তিনি বিস্মিত হলেন! অনেকক্ষন চুপ থাকলেন, তারপর আবার বিশেষ কক্ষে আটকে রাখলেন। খাবার দেয়া হলো!
এইসবের ফাঁকে ফাঁকে চেলা চামুন্ডারা এসে আসমানি প্রশ্ন নিয়ে হাজির হতো! ততক্ষনে আমার পরিবার এবং শুভাকাংক্ষি মহলে নানান উত্তেজনা আশংকা বিরাজ করছে! নেতা কর্মিদের মধ্যে অজানা আশংকা দেখা দিচ্ছে! ৪৮ ঘন্টা পর আমাকে সাধারন লকআপে স্থানান্তর করা হলো! তখন আমি নিশ্চিত হলাম আমি নিরাপদ!
লকআপের ভিতের দেখা মিললো, আলোচিত পুলিশ হত্যা মামলার প্রধান আসামি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, পল্টন থানা ছাত্রদলে নেতা জ্যাকি, সুত্রাপুর থানা ছাত্রদল নেতা রকি এবং আরও অনেক নেতা!
১৮ তারিখ রাত লকাপে কাটলো! ১৯ তারিখ সকাল ৯ টায় ডাক পড়লো! এসআই নানান অফার দিলেন! অনেক অফার পাশ কাটিয়ে আবার লকাপে পাঠানো হলো! সেখান থেকে সিএমএম কোর্ট, তারপর কেন্দ্রীয় কারাগার! এরপর টানা দুইমাস কারাবরন!
ডিবি অফিসে থেকেই জানতে পারলাম, হাজিগন্জ থানায় আমার নামে প্রধান আসামি করে আরেকটি মামলা করা হয়েছে! তখন বুঝতে পারলাম, কারাবরন অনেক দীর্ঘ হবে!
ঢাকা কারাগারে ১৫দিন থাকার পর চাঁদপুর কারাগারে প্রেরন করা হলো! হাতে পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরে ঢাকা থেকে নদিপথে চাঁদপুর আসা। মানুষের উৎসুক দৃষ্টি নিজেকে তখন ভয়ংকর মনে হচ্ছিলো! তবে যারা বুঝতেন, তাদের চোখের দৃষ্টি আমাকে স্বস্তি দিতো! তারা বুঝতো আমি রাজনৈতিক আসামি! তখন কিছুটা উৎসাত কাজ করতো!
মাঝপথে কারাগারে প্রবেশের আগে স্ত্রী সন্তান মায়ের সাথে দেখা করার একটা স্বল্প সুযোগ হলো! যারা কারাবরন করেছেন, তারাই জানেন এই ক্ষনটা কতোটা আবেগের!
অনেক লম্বা যুদ্ধ আমরা করেছি! সেই যুদ্ধের ধারাবাহিকতাই আজকের বিজয়! হঠাৎ করেই কিছু হয়নি! আসমান থেকে পড়েনি স্বাধীনতা! ইনশাআল্লাহ এই বিজয় টিকে থাকবে! আমরা পরাস্ত হবো না।
