বেওয়ারিশ মানুষের শেষযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে কেনা হয়েছিল দুটি অ্যাম্বুলেন্স। উদ্দেশ্য ছিল চাঁদপুরের বিভিন্ন স্থান থেকে পরিচয়হীন মানুষের মরদেহ এনে গোসল, কাফন ও দাফনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু বর্তমানে দুটি অ্যাম্বুলেন্সই অচল। ফলে চাঁদপুরের বিভিন্ন থানা ও সরকারি দপ্তর থেকে বেওয়ারিশ লাশ অটোরিকশা, ভ্যান কিংবা অন্য যানবাহনে করে পৌর গোরস্থানে নিতে হচ্ছে।
এতে লাশ পরিবহনের সময় দুর্গন্ধ ছড়ানো ও পরিবেশদূষণের পাশাপাশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। প্রায় ৭৪ বছরের পুরোনো মানবিক প্রতিষ্ঠান অন্জুমানে খাদেমুল ইনসানের গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
অন্জুমানে খাদেমুল ইনসান সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির চাঁদপুর পৌর গোরস্থানে মাসে গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়। কোনও কোনও মাসে এ সংখ্যা কম-বেশি হয়। জেলার বিভিন্ন থানা থেকে উদ্ধার হওয়া পরিচয়হীন লাশের পাশাপাশি নদী ও নৌযান দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মরদেহও এখানে আনা হয়। এসব লাশের গোসল, কাফন ও দাফনের দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানটি।
দীর্ঘদিন ধরে অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ থাকায় এখন লাশ পৌঁছানোর দায়িত্ব অনেকটা সংশ্লিষ্ট থানা ও সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর পড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বেওয়ারিশ লাশ পরিবহনের জন্য ২০১৪ সালে প্রায় ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়। পরে ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নামে অন্জুমানে খাদেমুল ইনসানের জন্য আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স দেন।
অন্জুমানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দুটি অ্যাম্বুলেন্সই দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নইম পাটোয়ারী দুলালের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অ্যাম্বুলেন্সের আয়-ব্যয়সহ পরিচালনার বিষয়গুলোও তার তত্ত্বাবধানে ছিল।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বেওয়ারিশ লাশ পরিবহনের পরিবর্তে অ্যাম্বুলেন্স দুটি দিয়ে বেশি ভাড়ায় সাধারণ রোগী পরিবহন করা হতো। এমনকি এর একটি মাদক পরিবহনে ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে।
২০২২ সালের ১১ মে বিকেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা এলাকায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর নামে দেয়া অন্জুমানের অ্যাম্বুলেন্সটি। পরে পুলিশ ওই অ্যাম্বুলেন্স থেকে ৬০৯ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে। তবে চালক পালিয়ে যান।
তখন অ্যাম্বুলেন্সটির চালক ছিলেন হারুন নামে এক ব্যক্তি। অন্জুমানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি আবু নইম পাটোয়ারী দুলালের ব্যক্তিগত চালক ছিলেন।
প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, ওই সময় অ্যাম্বুলেন্সটি রোগী পরিবহন করে মাসে আনুমানিক এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয় করত। দুর্ঘটনার পর দীর্ঘদিন কুমিল্লায় পড়ে থাকার পর সেটি চাঁদপুরে এনে মেরামত করা হয়। পরে আবারও চলাচল শুরু করে।
এর কয়েক বছর পর একই অ্যাম্বুলেন্সকে ঘিরে আবারও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়নের নিজগাছতলা এলাকায় ওই অ্যাম্বুলেন্সে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সের চালক মো. মুরাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চাঁদপুর মডেল থানা পুলিশ জানায়, রাত সোয়া ১২টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে ঘটনাটি ঘটে। ওই সময় টহলরত পুলিশ সড়কের পাশে অ্যাম্বুলেন্সটি থামানো অবস্থায় দেখতে পায়। সন্দেহ হওয়ায় তল্লাশি চালিয়ে ভেতর থেকে ওই নারীকে উদ্ধার করা হয় এবং চালক মুরাদ হোসেনকে আটক করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মুরাদ হোসেন চাঁদপুর শহরের প্রফেসরপাড়ার বাসিন্দা মোস্তফা বেপারীর ছেলে। তিনি ভাড়ায় অন্জুমানের অ্যাম্বুলেন্সটি পরিচালনা করতেন। এ ঘটনায় করা মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মুরাদ হোসেন চাঁদপুর শহরের প্রফেসরপাড়ার বাসিন্দা মোস্তফা বেপারীর ছেলে। তিনি ভাড়ায় অন্জুমানের অ্যাম্বুলেন্সটি পরিচালনা করতেন। এ ঘটনায় করা মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
ধর্ষণের মামলার পরও কিছু সময় অ্যাম্বুলেন্সটি চলাচল করে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর মতলব উত্তর উপজেলার দুর্গাপুর এলাকায় সিএনজি অ্যাম্বুলেন্সটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এরপর সেটি আর নিয়মিত সেবায় ফেরেনি।
বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্সটি হাজীগঞ্জের একটি গ্যারেজে মেরামতের জন্য রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অন্জুমানের বর্তমান সভাপতি।
অন্য অ্যাম্বুলেন্সটির অবস্থাও প্রায় একই। ২০২৪ সাল থেকে এটি অচল অবস্থায় পড়ে আছে। চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড মসজিদের পাশে ত্রিপাল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। গত ১৭ আগস্ট বিকেলেও সেখানে সেটিকে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
ফলে দুটি অ্যাম্বুলেন্সের কোনোটিই বর্তমানে বেওয়ারিশ লাশ পরিবহনে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
অন্জুমানে খাদেমুল ইনসানের বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন সরকার বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ১৭ সদস্যের পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন কমিটি দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর কুমিল্লা থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এসেছি। অপরটি অনেক পুরোনো হওয়ায় অচল। বর্তমানে দুটি অ্যাম্বুলেন্সই হাজীগঞ্জের একটি গ্যারেজে মেরামতের জন্য আছে।
আগের ব্যবস্থাপনার অনিয়ম বা আয়-ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর একজন ম্যানেজার নিয়োগ দিয়েছি। তিনি সব হিসাব রাখছেন। এর আগের সময়ের বিষয়ে আমাদের কাছে কিছুই নেই।
তবে তার এই বক্তব্যে আগের ব্যবস্থাপনায় অ্যাম্বুলেন্স দুটির আয়-ব্যয় ও ব্যবহার কীভাবে হয়েছে, সে প্রশ্নের পুরোপুরি উত্তর মেলে না।
বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থাপনাও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। অন্জুমানের ম্যানেজার মো. আবুল বাশার জানান, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অফিসের তিনটি ফ্লোরের ভাড়া বাবদ প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে মাত্র ১৫ হাজার ৮০০ টাকা। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া থেকে এসেছে ৭০ হাজার টাকা।
অনুদান, সদস্য চাঁদাসহ মোট সাতটি খাত মিলিয়ে ওই এক বছরে আয় হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা।
আবুল বাশার বলেন, ‘স্টাফ ও অন্যান্য খরচে টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। এখন ধার করে চলতে হচ্ছে।’
বর্তমানে তার সঙ্গে অন্জুমানে আরও তিনজন কর্মী রয়েছেন। তারা বেওয়ারিশ লাশের গোসল, কাফন ও দাফনের কাজে যুক্ত।
১৯৫২ সালে তৎকালীন এমপি মরহুম আব্দুল করিম পাটোয়ারীর উদ্যোগে বেওয়ারিশ লাশের গোসল, কাফন ও দাফনের জন্য চাঁদপুরে অন্জুমানে খাদেমুল ইনসান প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠানটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তাঁর বড় ছেলে আবু নইম পাটোয়ারী দুলাল দায়িত্ব নেন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবু নইম পাটোয়ারী দুলাল আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
প্রায় ৭৪ বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজ ছিল স্বজনহীন মানুষের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা। অথচ এখন সেই কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ—লাশ বহনের দুটি অ্যাম্বুলেন্সই অচল।
একটি অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে মাদক উদ্ধারের ঘটনা, পরে ধর্ষণের অভিযোগ ও দুর্ঘটনার ইতিহাস; অন্যটি দীর্ঘদিন পড়ে থেকে অচল হয়ে আছে। ফলে পরিচয়হীন মানুষের মৃত্যুর পর তাদের শেষযাত্রাও যেন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মাসে গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি বেওয়ারিশ লাশের জন্য এখন অটোরিকশা, ভ্যান কিংবা অন্য যানবাহনই ভরসা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই মানবিক সেবা স্বাভাবিক করতে শুধু অ্যাম্বুলেন্স দুটি মেরামত করলেই হবে না; আগের ব্যবস্থাপনায় এগুলোর ব্যবহার, আয়-ব্যয় ও দায়িত্বশীলতার বিষয়গুলোও স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
