ভোরের আলো ফুটতেই মেঘনার পাড়ে শুরু হয় ব্যস্ততা। নদী পেরিয়ে ট্রলারে করে চরাঞ্চল থেকে একে একে আসতে থাকেন কৃষকরা। কারও হাতে সবজি, কারও সঙ্গে হাঁস-মুরগি, আবার কোথাও মাছ নিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। সকাল গড়ানোর আগেই জমে ওঠে বেচাকেনা। আর দুই ঘণ্টা পরই অনেকটা ফাঁকা হয়ে যায় পুরো বাজার।
চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার তেলিরমোড় লঞ্চঘাটে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী বাজার স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘দুই ঘণ্টার বাজার’ নামে। দীর্ঘদিন ধরে চরাঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বাজারটি।
স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রায় এক যুগ আগে বাজারটির যাত্রা শুরু হয়। চরাঞ্চলের কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত লাউ, কুমড়া, পেঁপে, শাক, মুলা, কাঁচা কলাসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজি এখানে নিয়ে আসেন। পাশাপাশি হাঁস-মুরগি, দুধ ও মাছেরও বেচাকেনা হয়।
বাজারটির বিশেষত্ব হলো, দিনের দীর্ঘ সময় নয়—মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এখানে মূল বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়। ভোর থেকে পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা নদীর পাড়ে জড়ো হতে থাকেন। কৃষকরাও দ্রুত তাদের পণ্য বিক্রি করে আবার চরাঞ্চলের দিকে ফিরে যান।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চরাঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই মূলত এই বাজারের সৃষ্টি। আগে এসব পণ্য নিয়ে কৃষকদের দূরের বিভিন্ন বাজারে যেতে হতো। এতে পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই বাড়ত। তেলিরমোড়ের বাজার চালু হওয়ার পর নদীপথে অল্প সময়ের মধ্যে পণ্য এনে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়।
শীত মৌসুমে বাজারটির ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। এ সময় চরাঞ্চলে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের তাজা সবজির চাহিদা বাড়ায় পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিও বেশি থাকে। এখান থেকে কেনা পণ্য হাইমচরের আলগী বাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বাজার শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়; চরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত। নদীবেষ্টিত দুর্গম এলাকার কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক পরিবার কৃষিকাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চরাঞ্চলের জমিতে পরিকল্পিতভাবে সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়ানো গেলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জেলার বাইরেও এসব পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও সহযোগিতা পেলে চরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে সময়ের সঙ্গে এই বাজারের বর্তমান চিত্র কতটা বদলেছে, বেচাকেনার পরিমাণ আগের অবস্থানে আছে কি না এবং কৃষকরা এখনো আগের মতো ন্যায্য দাম পাচ্ছেন কি না—তা জানতে সরেজমিনে বাজারটি ঘুরে দেখা প্রয়োজন।
