চাঁদপুরের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র হাজীগঞ্জ বাজারের একসময়ের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও সাবেক ছাত্রনেতা নজরুল ইসলাম ফারুক বর্তমানে শ্রবণপ্রতিবন্ধী জীবনযাপন করছেন। নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক মামলা-হামলা এবং পুলিশি নির্যাতনের কারণে তিনি শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
দলের জন্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করেও বর্তমানে কোনো সহায়তা না পাওয়ার আক্ষেপ জানিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে নিজের জীবনের কষ্ট ও পরিবারের দুর্দশার কথা তুলে ধরার সুযোগ চান।
নজরুল ইসলাম ফারুকের বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহমাহমুদপুর ইউনিয়নের বড় শাহতলী মজুমদার বাড়িতে। বর্তমানে তিনি হাজীগঞ্জ উপজেলার টোরাগড় গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন।
একসময় হাজীগঞ্জ বাজারে তিনি ‘নাবিলা ফ্যাশন কর্নার’ ও ‘লিপি গার্মেন্টস’-এর স্বত্বাধিকারী ছিলেন। তিনি বিএ ফার্স্ট ক্লাস ও এমএ পাস করেছেন। শ্রবণপ্রতিবন্ধী হয়ে পড়ার পর ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যাওয়ায় তিনি ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
পরিবারের দাবি, ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় বিভিন্ন মামলা-হামলা ও পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন নজরুল ইসলাম ফারুক। ১/১১-এর সময় হাজীগঞ্জে শ্বশুরবাড়ি থেকে পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে তাকে মারধর করা হয় এবং পরে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হয়। ওই নির্যাতনের পর থেকেই তার শ্রবণশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একপর্যায়ে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় বলে তিনি দাবি করেন।
নজরুল ইসলাম ফারুক নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে চাঁদপুরের নির্যাতিত ছাত্রনেতাদের একজন হিসেবে পরিচিত। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল শাখার সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, চাঁদপুর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রদলের ভিপি পদপ্রার্থী, জেলা ছাত্রদলের সাবেক কোষাধ্যক্ষ এবং চাঁদপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ রাজুর আন্দোলনসঙ্গী ছিলেন বলে জানা গেছে।
রাজনীতির পাশাপাশি তিনি চাঁদপুরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কম্পন’-এর সাহিত্য ও প্রচার সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি একসময় জাতীয় দৈনিক দিনকাল-এর চাঁদপুর প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেছেন।
নজরুল ইসলাম ফারুকের স্ত্রী একজন নারী উদ্যোক্তা। ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় তিনি উচ্চসুদের ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে পরিবারের অভিযোগ। বর্তমানে ঋণের চাপ ও ব্যবসায়িক সংকটে তাদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্বল্পসুদে ঋণ বা সরকারি সহায়তা পেলে পরিবারটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আশা করছেন তারা।
নজরুল ইসলাম ফারুকের তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। বড় মেয়ে এমএ অধ্যয়নরত। জমজ দুই মেয়ে নাবিলা ও মেঘলা হাজীগঞ্জ মডেল কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে বর্তমানে চাঁদপুর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পড়াশোনা করছেন। তাদের ছোট ভাই মেহেদী ইসলাম বায়েজীদ কোরআনে হাফেজ।
শ্রবণপ্রতিবন্ধী নজরুল ইসলাম ফারুক বলেন, “১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে চাঁদপুর শহরের চিত্রলেখা মোড়ে আমরা মিছিল বের করি। ওই মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। আমার পাশে থাকা রাজু গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শহীদ হন। আমি হামলার সময় দৌড়ে প্রাণে রক্ষা পাই।”
তিনি আরও বলেন, “মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় আমার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ছিল, যা আমি জানতাম না। পরে আমাকে আটক করে নির্যাতন করা হয়। দলের জন্য অনেক কিছু করেছি। এখন আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমার জীবনের কষ্ট ও পরিবারের আকুতি তুলে ধরতে চাই।”
পরিবারের সদস্যরা জানান, রাজনৈতিক ও মানবিক বিবেচনায় নজরুল ইসলাম ফারুকের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং তার স্ত্রীকে স্বল্পসুদে ঋণ বা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে পরিবারটি নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারবে।
