ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন–এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. রাজীব খাদেমকে ঘিরে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। রাজধানীর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তিনি ‘জুলাই হত্যা মামলা’রও একজন আসামি বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, মামলার জটিলতা এড়াতে বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি তৎপরতা চালাচ্ছেন।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে তার দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এতে শুধু নগর উন্নয়নের স্বচ্ছতাই নয়, আন্তর্জাতিক তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিয়েও জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে World Bank–এর অর্থায়নে পরিচালিত ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট (ডিসিএনইউপি)’কে কেন্দ্র করে। কামরাঙ্গীরচরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গণপরিসর, পার্ক ও খেলার মাঠ উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া এ প্রকল্পে শুরু থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
প্রথমে প্রেম রতনকে নিয়োগ দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে ইঞ্জিনিয়ার ফরহাদকে নিয়োগ দিলেও ‘বনিবনা না হওয়া’র অজুহাতে তাকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। বিস্ময়করভাবে, কিছুদিন পর কোনো দৃশ্যমান নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করেই ফরহাদকে পুনরায় একই পদে ফিরিয়ে আনা হয়। এ ধরনের অস্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া পুরো প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
শুধু নিয়োগ বাণিজ্যই নয়, কমিশন ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ১২ কোটি টাকার প্রকল্প থেকে ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত কমিশন না পেলে প্রকল্প স্থগিত বা ভন্ডুল করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হতো বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এর ফলে প্রকল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয় এবং কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ক্ষমতার প্রভাব ও মামলার প্রেক্ষাপট অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে দলীয় প্রভাবশালী নেতা ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে তিনি সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন প্রকল্পে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করেন। সেই সময়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে আড়ালে নিলেও ‘জুলাই হত্যা মামলা’য় অভিযুক্ত হন। রামপুরা থানায় দায়ের করা মামলার নম্বর ২২৪/২৫–এ তিনি ৩৪ নম্বর আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। তবে অভিযোগ উঠেছে, কিছুদিন বিরতির পর আবারও কৌশলে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন তিনি।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রশ্ন
লালকুঠি (নর্থব্রুক হল) সংস্কার প্রকল্পের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন রাজীব খাদেম। ঐতিহ্যবাহী এ ভবনকে প্রাচীন জৌলুসে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় মানহীনতা ও অসন্তোষজনক অগ্রগতির অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া ট্র্যাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে রাজধানীতে যাত্রী ছাউনি নির্মাণ, ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল আধুনিকায়ন প্রকল্পের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। যানজট নিরসন ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া এসব প্রকল্পে তদারকির ঘাটতি, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে প্রকল্পগুলোর প্রত্যাশিত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
জনআস্থা সংকটে নগর উন্নয়ন কার্যক্রম
ক্রমবর্ধমান এসব অভিযোগের কারণে নগর উন্নয়ন কার্যক্রমের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে এসে ঠেকেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়োগে অস্বচ্ছতা, কমিশন দাবি এবং নিম্নমানের কাজ নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে।
নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জটিল শহরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সৎ নিয়োগ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে নগর উন্নয়ন প্রক্রিয়া পুনরায় স্বচ্ছতা ও জনআস্থার পথে ফিরে আসতে পারে।
এ ব্যাপারে রাজিব খাদেমের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করলে, তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপে তার মন্তব্য জানতে চাইলেও তিনি কোন যোগাযোগ করেননি।
