প্রিন্ট তারিখ: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chandpur Tribune Logo

ঋণ পরিশোধের জন্য সইতে হয় অপমান, অভিমানে চাঁদপুরের রিকশাচালকের বিষপান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

চাঁদপুরে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে সুলতান মাহমুদ রুবেল (৩৮) নামে চার সন্তানের এক বাবা বিষপান করেছেন। বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) রাত আনুমানিক ৩টায় চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

রুবেল চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহমাহমুদপুর ইউনিয়নের শাহতলী গ্রামের গাজী বাড়ির মৃত দুলাল গাজীর ছেলে। তিনি পেশায় একজন রিকশাচালক এবং তার স্ত্রী হালিমা বেগম বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করেন।
এদিকে, আত্মহত্যায় মৃত্যুর খবর পেয়ে চাঁদপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক বিল্লাল হোসেন মৃত রুবেলের মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল এবং ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন।
সুলতান মাহমুদ রুবেলের স্ত্রী হালিমা বেগম জানান, তা স্বামী পেশায় একজন রিকশাচালক। দাম্পত্য জীবনে তাদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। কয়েক বছর আগে তার স্বামী দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য এলাকার বিভিন্ন মানুষ এবং এনজিও থেকে অনেক টাকা কিস্তিতে ঋণ করেন। সেই টাকা পরিশোধ করতে না পারায় এলাকার মানুষ এবং এনজিওর লোকদের কাছে নানাভাবে অপমানিত হন। এসব অপমান সহ্য করতে না পেরে রুবেল তার স্ত্রীকে নিয়ে চাঁদপুর শহরের ব্যাংক কলোনি এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। আর সন্তানরা নানা বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতেন। কয়েকদিন আগে তার স্বামী নিজ বাড়িতে (শাহতলী গ্ৰামে) যান। সেখানে গত ৩০ নভেম্বর বিষপান করেন। খবর পেয়ে স্বামীকে উদ্ধার করে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে এসে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করান।
হালিমা বেগম বলেন, ‘মৃত্যুর আগে আমার স্বামী আমাকে বলেছিল বাড়িতে তার বড় ভাইয়ের ছেলে তাকে মারধর করেছে। তাছাড়া ঋণের টাকার জন্য মানুষ অপমান করেছে। সেই অপমানে তিনি বিষ পান করেছেন। এতদিন তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, কিন্তু তার পরিবারের কেউ এসে খোঁজ নেয়নি। স্বামীর ঋণ পরিশোধ করতে আমি নিজেও বিভিন্ন বাসা বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেছি। বর্তমানে চাঁদপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে আয়ার কাজ করছি। আমার পরিবারের কাছ থেকেও অনেক টাকা এনে স্বামীকে ঋণ পরিশোধ করতে দিয়েছি। চারটা সন্তান নিয়ে এখন আমি কিভাবে বাঁচবো।’
 
এদিকে মো. সুলতান মাহমুদ রুবেলের মৃত্যুর পর একটি চিরকুট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রুবেলের হাতে লেখা দাবি করা ওই চিরকুটে তার মৃত্যুর জন্য শাশুড়ি, শ্যালিকা এবং শ্যালককে দায়ি করা হয়। নিরক্ষর রুবেলের সুন্দর হাতের লেখায় দাবি করা ওই চিরকুট নিয়ে নানান রহস্য এবং ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে।
 
রুবেলের স্ত্রী হালিমা বেগম চিঠির বিষয়ে বলেন, ‘আমার স্বামী লেখাপড়া জানতো না। আমি তাকে কোনো রকম নিজের নাম লেখা শিখিয়েছি। তার ন্যাশনল আইডি কার্ডে তার হাতের একটি স্বাক্ষর রয়েছে। এই স্বাক্ষরের সাথে চিঠির হাতের লেখার কোনো মিল নেই। এই চিঠি কোন ভাবেই তার হাতের লেখা নয়।’
 
মৃত রুবেলের হাতে লেখা দাবি করা ওই চিরকুটে উল্লেখ করা হয় (চিরকুটের লেখার একাংশ হুবহু তুলে ধরা হলো) ‘ আমার মৃত্যুর জন্য আমার শাশুরি দাই। আমার মৃত্যুর জন্য আমার শালি দই। আমার মৃত্যুর জন্য আমার শালা দায়ি। আমার পরিবার দাই নাই।’
 
স্থানীয়দের দাবি মৃত্যুর তিনদিন পরে এই চিরকুটটি কিভাবে প্রকাশ্যে এলো এবং কার মাধ্যমে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লো, সেটি তদন্ত করলে এর রহস্য বেরিয়ে আসবে। কারণ চিঠির হাতে লেখা দেখে বুঝা যায় এটি কোনো উচ্চ শিক্ষিত মানুষের। তাছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে চিঠিতে অনেকগুলো শব্দ ভুল লেখা হয়েছে। যাতে করে কেউ বুঝতে না পারে, এটি রিকশাচালক রুবেলের হাতে লেখা নয়। নিহত রুবেলের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের স্বাক্ষর এবং চিরকুটের হাতের লেখা মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাহার মিয়া জানান, এই ঘটনায় রুবেলের ভাইদের পক্ষ থেকে  একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেখানে তার স্ত্রী, শাশুড়ি, শ্যালিকা এবং শ্যালককে আসামি করা হয়েছে। পরবর্তী আইনি কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
চিফ এডিটর: জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়
সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান পাটোয়ারী
আইন উপদেষ্টা: অ্যাডভোকেট শামসুল আলম পাটোয়ারী
সহকারী সম্পাদক: মোঃ সিদ্দিকুর রহমান (নয়ন)
বার্তা সম্পাদক: রাফিয়া নুসরাত নিদি
যোগাযোগ: +৮৮ ০১৮১৭-৭৫০৯১০, [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: chandpurtribune.com | © ২০২৬ চাঁদপুর ট্রিবউন