ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মিরের পেহেলগামে হামলার পর থেকে ভারত-পাকিস্তান গত কয়েকদিন ধরে তীব্র বাগযুদ্ধে জড়িয়েছে। প্রতিবেশী দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক কয়েকটি শিরোনাম থেকে অনুমান করা যায়।
‘‘ভারত পাকিস্তানের জল বন্ধ করলে তা যুদ্ধ বলে গণ্য হবে: পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি’’, ‘‘হামলাকারী ও হামলার পরিকল্পনাকারীদের কল্পনাতীত সাজা দেওয়া হবে : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’’, ‘‘প্রত্যেক নাগরিকের মৃত্যুর বদলা নেবে পাকিস্তান: প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ’’ কিংবা ‘‘ভারত ও পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ দেখানো উচিত: জাতিসংঘ’’; এমন বহু শিরোনাম হয়েছে উভয় দেশের গণমাধ্যমে।
এই পরিস্থিতি নানা অনিশ্চয়তার জন্ম দিচ্ছে। গত ২২ এপ্রিল ভারত শাসিত কাশ্মিরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। মূলত এই হামলায় কেবল পর্যটকদের নিশানা করা হয়েছিল এবং এই ঘটনার পর থেকে দুই দেশের মাঝে উত্তেজনা তুঙ্গে পৌঁছেছে। সীমান্তের একদিকে যেমন সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের দাবি জোরালো হয়েছে, তেমনই অন্যপ্রান্তে ‘সমুচিত জবাব’ দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প নেওয়া হয়েছে।
চলমান এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে, ‘উত্তেজনার সবচেয়ে বিপজ্জনক অধ্যায়’ পেরিয়ে গেছে কি না? এই প্রশ্ন ওঠার কারণ অতীতে উরি ও পুলওয়ামায় হামলার পর ভারত যে কৌশল অবলম্বন করেছিল। দুই ক্ষেত্রেই ভারত সরকারের নির্দেশে আন্তঃসীমান্ত অভিযান চালানো হয়েছিল। সেই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।
পুলওয়ামার ঘটনার পর ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা চালানো হয়। এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ পাকিস্তান পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। এই আবহে যখন ভারতীয় বিমানবাহিনীর কমপক্ষে একটি বিমান ধ্বংস এবং ভারতীয় পাইলটকে আটক করে পাকিস্তান, তখন দুই দেশের মধ্যে বড়সড় আকারের সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
পেহেলগামে হামলার জন্য এখন পর্যন্ত ভারত পাকিস্তানকে সরাসরি দায়ী করেনি, যেমনটা অতীতে দেখা গেছে। কিন্তু ভারত সরকার সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত, প্রধান সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করাসহ একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা এই হামলার জন্য ভারত কাকে দায়ী বলে মনে করে সে বিষয়ে একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
পাশাপাশি, ভারত শাসিত কাশ্মিরের অনন্তনাগ পুলিশ এই ঘটনায় সন্দেহভাজন হামলাকারীদের স্কেচ প্রকাশ করেছে। তাদের মধ্যে দু’জন পাকিস্তানি নাগরিক রয়েছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে প্রমাণের অভাবে প্রথাগত ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতের তরফ থেকে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে নানারকম জল্পনা-কল্পনা চলছে। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য সেগুলোকে আরও জোরদার করছে।
এর আগে, ভারতের পক্ষ থেকে যে সমস্ত কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে এই চলমান সংঘাত আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নিতে পারে, তা জানার চেষ্টা করেছে বিবিসি।
বিবিসি বিশেষজ্ঞদের কাছে জানতে চেয়েছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার কি আরও একবার আন্তঃসীমান্ত পদক্ষেপের কৌশল গ্রহণ করতে পারে? তা যদি হয়, তাহলে তার জবাবে পাকিস্তান কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে?
তবে এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখে নেওয়া যাক ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সেগুলো অস্বাভাবিক কি না।
• ভারত-পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি সিদ্ধান্ত
পেহেলগামে ২২ এপ্রিল হামলার পর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত, ওয়াঘা-আটারি সীমান্ত বন্ধ, ভিসা সুবিধা প্রত্যাহার এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করাসহ একাধিক সিদ্ধান্ত সেই তালিকায় আছে।
এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ পাকিস্তানের তরফে সিমলা চুক্তি স্থগিত, সীমান্ত বন্ধ, বাণিজ্য স্থগিত, ভারতের ওপর পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ভারতের মতো পাকিস্তানও প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ও তাদের সহযোগীদের দেশ ছাড়তে এবং কূটনীতিকদের সংখ্যা সীমিত করতে বলেছে।
পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি ভারতের তরফে নেওয়া সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসলামাবাদ বলেছে, ভারত যদি এই চুক্তি থেকে সরে এসে পাকিস্তানের দিকে জলপ্রবাহ বন্ধ করে বা জল অন্যদিকে চালিত করার চেষ্টা করে, তাহলে তা যুদ্ধের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। পূর্ণ শক্তি দিয়ে এর জবাব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান।
প্রসঙ্গত, ১৯৬০ সালের বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি কিন্তু যুদ্ধ, সংকট ও উত্তেজনা সত্ত্বেও বহাল ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ভারতের তরফে এই চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত একটা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ‘চাপ সৃষ্টি’ করতে পানির মতো মৌলিক সম্পদ ব্যবহার করতে প্রস্তুত।’ এই সিদ্ধান্তকে ‘বিপজ্জনক পদক্ষেপ’ হিসেবে মনে করছেন কেউ কেউ।
পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকের পর এক সাংবাদিক সম্মেলনে সে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বারবার দাবি করেছেন, ভারতের পক্ষ থেকে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, তার কাছে এমন তথ্য রয়েছে যে, আগামী দিনে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় সশস্ত্র কর্মকাণ্ড বাড়াতে ভূমিকা পালন করতে পারে ভারত। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানিয়েছেন, এমনটা ঘটলে পাকিস্তান তার কড়া জবাব দেবে এবং প্রত্যেক নাগরিকের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে।
• বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি ইঙ্গিত করছে, এই সংকট এখন আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বিবিসিকে বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তান মারাত্মক সংকটের দিকে যাচ্ছে।
তিনি বলেছেন, ‘‘পেহেলগাম হামলায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং এর জবাবে ভারতের লক্ষণীয় সিদ্ধান্ত, বিশেষত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করা প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি আর মধ্য স্তরের উত্তেজনায় সীমিত নয়।