বর্ষাকাল শেষে প্রকৃতিতে এখন হেমন্তের নতুন রূপ। পলি জমা নিচু জলাশয়, খাল-বিল ও ডোবায় পানির গভীরতা কমতে শুরু করেছে। আর পানির গভীরতা কমার সঙ্গেই গ্রাম বাংলার জলাশয়ে ফুটে থাকা নীল-সাদা কিংবা লাল শাপলার সুন্দর দৃশ্যগুলো রূপ নিচ্ছে এক দারুণ সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরা ফলে।
রূপসী বাংলার জলাশয়ে শোভা পাওয়া শাপলা ফুল ঝরে পড়ে তৈরি হয় এই গোলাকার বীজাধার বা ‘ঢ্যাঁপ’ ফল। বর্ষা শেষে হেমন্তের এই রূপান্তরের দিনে ঢ্যাঁপ সংগ্রহের এক উৎসবমুখর আমেজ এখন ছড়িয়ে পড়েছে নীলফামারীর বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার দোলাপাড়া গ্রামের ৫০ বছর বয়সী কৃষিজীবী আসেদুল ইসলাম। সারাদিনের মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনির পর ক্লান্তি ভুলে তিনি ছোটেন জলাশয়ে। হাঁটু পানিতে নেমে এক এক করে থোকায় থোকায় জমে থাকা শাপলার ফল অর্থাৎ ‘ঢ্যাঁপ’ সংগ্রহ করেন তিনি।
আসেদুল ইসলাম জানান, সারাদিনের কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় হাতের মুঠোয় এই ফল নিয়ে ফিরলে ঘরের শিশুদের মুখে আনন্দের হাসি ফোটে। শিশুদের মন জয় করার পাশাপাশি এই মৌসুমে কুড়ানো ঢ্যাঁপ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে কিছুটা বাড়তি আয়ও হচ্ছে তার মতো আরো অনেকের।
শালুকফল বা শালুকের ঢ্যাঁপ হলো শাপলা গাছের ফুল ঝরে যাওয়ার পর তৈরি হওয়া গোল বা ডিম্বাকৃতির ফল, যা মূলত শাপলা গাছের বীজাধার (Seed pod) হিসেবে কাজ করে। ওপরের খোসা ছাড়িয়ে নিলে ভেতরে সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকে ক্ষুদ্র কালচে-বাদামী বা ধূসর রঙের বীজ।
এই ঢ্যাঁপ সরাসরি যেমন খাওয়া যায়, তেমনি প্রক্রিয়াজাত করা যায়। কাঁচা ফলের ওপরের কচি অংশ কেটে ভেতরের নরম বীজ খেলে পাওয়া যায় এক বিশেষ মিষ্টি ও সুস্বাদু স্বাদ। অনেকে এটি সেদ্ধ করেও খান। এছাড়া ঢ্যাঁপ রোদে শুকিয়ে ভেতরের বীজ বের করে তৈরি করা হয় ‘ঢ্যাঁপের ধান’। সেই ধান গরম বালিতে ভেজে তৈরি হয় মচমচে ‘ঢ্যাঁপের খই’। এই খইয়ের সাথে খেজুরের গুড় মেখে তৈরি ঢ্যাঁপের নাড়ু ও মোয়া গ্রামবাংলার এক অত্যন্ত জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবার।
পুষ্টিবিদেরর মতে, স্বাদের পাশাপাশি এই দেশীয় ফলের পুষ্টিগুণও অতুলনীয়। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে শর্করা ও আঁশ (ডায়েটারি ফাইবার), যা হজমপ্রক্রিয়া উন্নত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স থাকায় এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ নিরাপদ ও উপকারী একটি স্ন্যাকস।
স্বল্পকালীন এই মৌসুমে পল্লী অঞ্চলের নিচু জলাশয় ও বিলে গ্রামবাসীর ঢ্যাঁপ কুড়ানোর চিরচেনা চিত্র রূপসী বাংলার প্রাকৃতিক রূপ ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়।