প্রিন্ট তারিখ: ২১ অক্টোবর, ২০২৬
Chandpur Tribune Logo

একই ধানগাছ থেকে মিলছে দুইবার ফলন: মুড়ি ধান চাষে নতুন সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬

একবার ধান রোপণ করেই একই জমি ও গাছ থেকে দুবার ধান উৎপাদনের উদ্ভাবনী প্রযুক্তিতে চমক দেখাচ্ছেন নীলফামারীর কৃষকেরা। কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় এই বিশেষ প্রযুক্তিকে বলা হয় ‘রেটুন ক্রপ’ বা ‘মুড়ি ধান’ চাষ। প্রথমবার ফসল কাটার পর অবশিষ্ট ধানগাছের গোড়া পরিচর্যার মাধ্যমে দ্বিতীয় দফায় বাড়তি ফলন ও আয় ঘরে তুলছেন স্থানীয় চাষিরা।

সাধারণত আমন ধান রোপণের আগে এবং বোরো ধান কাটার পর জমি প্রায় ৪৫ থেকে ৭০ দিন পতিত পড়ে থাকে। ওই পতিত সময়ের সঠিক ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করছে এই রেটুনিং পদ্ধতি। নীলফামারীর মুন্সিপাড়া গ্রামের সফল নারী কৃষক শামিমা নাসরিন তেমনই এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

তিনি তার ৩৪ শতক জমিতে ‘ব্রি ধান-৯৮’ জাতের ধান রোপণ করেছিলেন। বাজারে গো-খাদ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকায় প্রথমবার তিনি ১৬ হাজার টাকায় পুরো কাঁচা ধানগাছ বিক্রি করে দেন। এরপর ধানগাছের নাড়া বা মুড়ি রেখে জমিটিতে নিয়ম মেনে সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা করেন। বর্তমানে সেই মুড়ি থেকেই থোকায় থোকায় সোনালী ধানের শীষ বের হয়ে শোভা বাড়াচ্ছে। একবারমাত্র চারা রোপণ করে দুটি ফসলের লাভ পাওয়ায় তার মুখে এখন আনন্দের হাসি।

স্থানীয় কৃষিবিদরা জানান, মূল ধান কাটার সময় মাটির গোড়া থেকে ২০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার (বা ৩০ সেন্টিমিটার) নাড়া রেখে দিতে হয়, যাতে গাছে অন্তত ২-৩টি নোড বা পর্ব অবশিষ্ট থাকে। ধান কাটার ৫ থেকে ৭ দিন পর বিঘাপ্রতি ৫ কেজি ইউরিয়া ও ৫ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করতে হয়। জমিতে এক থেকে দেড় ইঞ্চি পরিমাণ পানি ধরে রাখা জরুরি, যেন নাড়া থেকে দ্রুত নতুন কুশি গজাতে পারে এবং মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। পরিমিত সার, সামান্য সেচ ও অল্প মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারে মাত্র ৩৫ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যেই মূল ফসলের ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত ফলন অর্জন করা সম্ভব।

কামারপাড়ার কৃষক আজিজুল ইসলাম জানান, এ প্রযুক্তিতে বীজতলা তৈরি, জমি চাষ ও নতুন চারা রোপণের বাড়তি কোনো খরচ লাগে না। জমি তৈরি, সেচ, সার ও শ্রমিক খরচ বাবদ মূল ফসলের তুলনায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যয় বেঁচে যায়। উপরন্তু, মূল ফসলের চেয়ে মুড়ি ধান পাকতে সময় লাগে প্রায় ৬৫ শতাংশ কম। ফলে খুব অল্প সময়ে ও নামমাত্র খরচে একই জমি থেকে বাড়তি ফলন পাওয়ায় শস্যের নিবিড়তা বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে এ পদ্ধতিতে সফল হতে হলে মূল ফসলের আন্তপরিচর্যা এবং সঠিক জাত নির্বাচনের ওপর জোর দিতে হবে। যেসব জাতের কুশি উৎপাদনক্ষমতা বেশি এবং বাতাসে সহজে ঢলে পড়ে না, সে ধরনের আগাম জাতের ধান নির্বাচন করা উত্তম। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রতিরোধে সঠিক সময়ে বালাইনাশক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হয়।

নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হুমায়রা মন্ডল এই প্রযুক্তির সুফলের কথা নিশ্চিত করে বলেন, “এলাকার কৃষকরা আউশ এবং আমন ধান কাটার পরপরই অনায়াসে মুড়ি ধানের চাষাবাদ করতে পারেন। খুব অল্প দিনেই এ ধান ঘরে তোলা যায়। এর পরপরই জমিতে দেরিতে হওয়া আলু (লেট ভ্যারাইটি) সহজেই চাষ করা সম্ভব। এতে জমির উর্বরতা ও সময়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকরা আর্থিকভাব দারুণ লাভবান হবেন।”

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও কম খরচে কৃষকের লাভ দ্বিগুণ করতে এই ‘মুড়ি ধান’ চাষ আগামী দিনে কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন দিক উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চিফ এডিটর: জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়
সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান পাটোয়ারী
আইন উপদেষ্টা: অ্যাডভোকেট শামসুল আলম পাটোয়ারী
সহকারী সম্পাদক: মোঃ সিদ্দিকুর রহমান (নয়ন)
বার্তা সম্পাদক: রাফিয়া নুসরাত নিদি
যোগাযোগ: +৮৮ ০১৮১৭-৭৫০৯১০, [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: chandpurtribune.com | © ২০২৬ চাঁদপুর ট্রিবউন