প্রিন্ট তারিখ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chandpur Tribune Logo

চাঁদপুরে ৯২ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই চিকিৎসক, কাগজে আছে পদায়ন!

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট, ২০২৬

চাঁদপুরের ৯২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক পদে নিয়োগ আছে। কিন্তু এসব কেন্দ্রে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন না একজনও এমবিবিএস চিকিৎসক। নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে রাখা হয়েছে। ফলে কাগজে চিকিৎসক থাকলেও বাস্তবে ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো চিকিৎসকশূন্য।

 

চিকিৎসক না থাকার পাশাপাশি এসব কেন্দ্রে অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরও বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটও রয়েছে। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা জেলা সদরে ছুটছেন। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ।

চাঁদপুরে ইউনিয়ন পর্যায়ে মোট ৯২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৭২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ের মানুষের কাছে সাধারণ রোগের চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার কথা। কিন্তু চিকিৎসকদের সংযুক্তি, দীর্ঘদিনের জনবল ঘাটতি ও ওষুধের অপ্রতুলতায় সেই কাঙ্ক্ষিত সেবা অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে।

 

সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের অনেককেই সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক পদায়নের তথ্য থাকলেও রোগীরা নিয়মিত এমবিবিএস চিকিৎসকের সেবা পাচ্ছেন না।

স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ে একজন চিকিৎসক নিয়মিত থাকলে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া, সংক্রমণসহ সাধারণ রোগের চিকিৎসা সেখানেই পাওয়া সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় ছোটখাটো অসুস্থতার জন্যও তাদের উপজেলা বা জেলা সদরে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে যাতায়াতের খরচ, সময় ও ভোগান্তি।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র কাছেই থাকলেও সেখানে চিকিৎসক না থাকলে সেই কেন্দ্র থাকার অর্থ কী- এ নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসকের সংকটের পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও রয়েছে বড় ঘাটতি।

 

 

উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের ৫৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন। শূন্য রয়েছে ৩৯টি পদ। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার ১৪২টি পদের মধ্যে কর্মরত ৫৯ জন। শূন্য রয়েছে ৮৩টি পদ। পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের ৯১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৮২ জন। এই পদে শূন্য রয়েছে ৯টি। আর পরিবার কল্যাণ সহকারীর ৫১৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৩৭ জন। শূন্য রয়েছে ১৭৬টি পদ।

অর্থাৎ, চিকিৎসকের পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও বিপুলসংখ্যক জনবল নেই। ফলে সীমিতসংখ্যক কর্মীর ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়ছে। এতে স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃস্বাস্থ্য কার্যক্রমসহ মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

চিকিৎসক ও জনবল সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওষুধের অপ্রতুলতা। সরকারি এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত ওষুধ না থাকায় অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।

 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চিকিৎসক ও ওষুধ—দুটিই যদি নিয়মিত পাওয়া যায়, তাহলে সাধারণ রোগের জন্য উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে। কিন্তু চিকিৎসক না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা কমছে।

এ ব্যাপারে চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহাদাত হোসাইন জানান, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেসব চিকিৎসককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে রাখা হয়েছে। এ কারণে তারা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত সময় দিতে পারছেন না।

তিনি আরও জানান, সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে যথাযথ সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হলে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হবে। সিভিল সার্জনের বক্তব্যেই স্পষ্ট, ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসক পদে নিয়োগ থাকলেও বাস্তবে অন্য প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তির কারণে সেই জনবল তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

 

চাঁদপুর পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মো. মোস্তফা কামাল জানান, জনবল সংকটের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে। শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য সরকার ইতিমধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর জনবল সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ওষুধ সংকটের বিষয়ে তিনি জানান, বর্তমানে কিছুটা ওষুধের সংকট রয়েছে। তবে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তখন ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা ও ওষুধ পাবেন।

সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। উপজেলা বা জেলা হাসপাতাল থেকে দূরে থাকা মানুষের জন্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রই হওয়ার কথা সবচেয়ে সহজলভ্য সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। কিন্তু সেখানে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকরাই যদি অন্যত্র সংযুক্তিতে থাকেন, গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য থাকে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধও নিয়মিত না পাওয়া যায়, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

 

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু নতুন করে জনবল নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ইউনিয়ন পর্যায়ের জন্য নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংযুক্তির প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করে যেসব চিকিৎসককে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফেরত পাঠানো সম্ভব, তাদের দ্রুত সেখানে দায়িত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি শূন্য পদগুলো পূরণ, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

চাঁদপুরের ৯২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র যদি চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল ছাড়া চলে তাহলে তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে- সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

চিফ এডিটর: জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়
সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান পাটোয়ারী
আইন উপদেষ্টা: অ্যাডভোকেট শামসুল আলম পাটোয়ারী
সহকারী সম্পাদক: মোঃ সিদ্দিকুর রহমান (নয়ন)
বার্তা সম্পাদক: রাফিয়া নুসরাত নিদি
যোগাযোগ: +৮৮ ০১৮১৭-৭৫০৯১০, [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: chandpurtribune.com | © ২০২৬ চাঁদপুর ট্রিবউন