প্রিন্ট তারিখ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chandpur Tribune Logo

মতলব উত্তরে এতিমের জন্য বরাদ্দ ৪৬ টন চালের বেশিরভাগই ‘গায়েব’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় ৪৬টি এতিমখানার বরাদ্দ করা ৪৬ টন চালের মধ্যে ২৫ টনেরও বেশি চাল হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে উপজেলার বেশ কয়েকটি এতিমখানা ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এতিমখানাগুলোর চাল লুটপাটের চিত্র উঠে আসে।

এসময় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার কলাকান্দি ইউনিয়নের ‘নেদায়ে ইসলাম আশিকে মানযুর (রা.) নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা’র নামে ১ টন চালের বাজার মূল্য ৫০ হাজার টাকার বেশি। কিন্তু চালের বদলে তাদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। এছাড়াও বিনন্দপুর মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা, সাতবাড়িয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, সুজাতপুর দরবেশ বাড়ি মাদ্রাসা ও এতিমখানাকে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, জিন নুরাইন ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, পশ্চিম ইসলামাবাদ মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ষাটনল আরাবিয়াতুল উম্মাহ মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ষাটনল হাফেজ আব্দুল লতিফ দাখিল মাদ্রাসা ও এতিমখানা, দারুল উলুম কাসেমিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, দশানী আল-আমিন আকরামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, সাড়ে পাঁচানী হোসাইনিয় মাদ্রাসা ও এতিমখানা, মোহনপুর আল হেরা মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানা, মুদাফর রহমানিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, মাথাভাঙ্গা মিলারচর মাদ্রাসা ও এতিমখানা, পাঁচআনী আমিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ আরও কয়েকটি এতিমখানায় গিয়েও একইরকম তথ্য জানা গেছে।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব মাদ্রাসার নামে ১ হাজার কেজি (১ টন) চাল বরাদ্দ ছিল। কিন্তু কেউ পেয়েছে ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি করে চাল। কোথাও কোথাও আবার, বসতঘরে এতিমখানার নামে নতুন ডিজিটাল সাইনবোর্ড ঝুলতে থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু ভেতরে ছোট বাচ্চাদের বসবাস বা লেখাপড়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

যদিও সেই এতিমখানাগুলোও সরকারি বরাদ্দ ১ টন চাল পাওয়ার তালিকায় রয়েছে।

কয়েকজন রাজনীতিবিদ, শিক্ষক ও নেতৃত্ব স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, পিআইও অফিস ও উপজেলা প্রকৌশল অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু দপ্তরেও তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির খবর কিছুদিন আগের থেকেই শোনা যাচ্ছিল। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য খুবই ভালো মানুষ। তার নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে এখনই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

এদিকে সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি এবং উপজেলা বিএনপি সহ-সভাপতি নুরুল আমিন মাস্টার অভিযোগ করে বলেন,

সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এক টন চাল পাওয়ার কথা থাকলেও আমাকে মাত্র ৬০০ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে। এতিমদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল আত্মসাৎ এর বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বলেও কোনো কার্যকর সমাধান পাইনি।

মতলব উত্তর উপজেলা বিএনপির সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) বশির আহমেদ খান বলেন, ‘এতিমদের চাল আত্মসাতের অভিযোগটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনার দায় আমরা নিতে চাই না। বিষয়টি কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। আমি এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) সঙ্গে কথা বলব এবং কীভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা দেখব।’

মূলত নিয়ম অনুযায়ী, মাদ্রাসাগুলোর জন্য বরাদ্দ করা চাল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় থেকে ওই দপ্তরের কর্মকর্তার উপস্থিতিতে এবং এতিমখানা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সাক্ষরের মাধ্যমে গোডাউন থেকে চাল সংগ্রহের কথা রয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ‘প্রভাবশালী একটি মহল’ পিআইও অফিসের প্রকল্পের খাতা নিয়ে এতিমখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগেভাগেই সাক্ষর আদায় করে নেয়। পরে তাদের বরাদ্দের অর্ধেকের কম চাল বিতরণ করা হয়, কোথাও কোথাও ধরিয়ে দেওয়া হয় নামমাত্র টাকা। কিন্তু এতিমখানা কর্তৃপক্ষ ক্ষুব্ধ হলে এতিমের চাল আত্মসাতের ঘটনাটি জানাজানি হয়।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ওসমান গনি বলেন, খাদ্য গুদাম থেকে এতিমখানার প্রতিনিধিদের চাল কখনও আমি নিজে দিয়েছি, কখনও আমার অফিসের স্টাফদের মাধ্যমে বিতরণ করেছি। তবে এখন পর্যন্ত চাল কম দেওয়ার বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এমদাদুল হক বলেন, ‘আমরা তালিকাভুক্ত প্রতিটি এতিমখানার নামে এক টন করে চালের ডিও (বরাদ্দপত্র) ইস্যু করেছি। এক টন চাল বরাদ্দের সব কাগজপত্র আমাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। বরাদ্দ দেওয়ার পর বাইরে কেউ কোনো অনিয়ম করে থাকলে সে বিষয়ে আমাদের জানা নেই।’

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, এতিমখানাগুলোকে চাল দেওয়ার কথা, টাকা দেওয়ার কোনো বিধান নেই। চাল কম দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমি এখনই খোঁজ নিয়ে দেখছি।

চিফ এডিটর: জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়
সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান পাটোয়ারী
আইন উপদেষ্টা: অ্যাডভোকেট শামসুল আলম পাটোয়ারী
সহকারী সম্পাদক: মোঃ সিদ্দিকুর রহমান (নয়ন)
বার্তা সম্পাদক: রাফিয়া নুসরাত নিদি
যোগাযোগ: +৮৮ ০১৮১৭-৭৫০৯১০, [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: chandpurtribune.com | © ২০২৬ চাঁদপুর ট্রিবউন