প্রিন্ট তারিখ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chandpur Tribune Logo

আজ চৈত্র সংক্রান্তি, বাংলা বছরের শেষদিন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

ঋতুচক্রের অনিবার্য আবর্তনে জীর্ণ-পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে মহাকালের গভীর গর্ভে বিলীন হতে চলেছে আরেকটি বাংলা বছর। চৈত্রের দহনদগ্ধ প্রখর দুপুরে, শুকনো পাতার মৃদু নূপুরধ্বনি যেন বাজিয়ে তোলে বিদায়ের এক বিষণ্ন সুর; সেই সুরে মিশে থাকে নতুনের আহ্বান, নবজাগরণের নীরব প্রতিশ্রুতি। বিদায় ও আগমনের এই অনির্বচনীয় সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে চৈত্র সংক্রান্তি যা বাংলার মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের এক গভীর প্রতীক।

আজ বাংলা সনের অন্তিম দিন-৩০ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। এই দিনটি কেবল একটি পঞ্জিকার সমাপ্তি নয়; এটি এক দীর্ঘ বছরের ক্লান্তি, জীর্ণতা ও গ্লানিকে মুছে ফেলার প্রতীকী মুহূর্ত। নতুন উদ্যমে, নব প্রত্যয়ে জীবনকে পুনরারম্ভ করার এক অন্তর্লীন প্রেরণা জাগায় চৈত্র সংক্রান্তি। তাই এটি শুধু বিদায়ের দিন নয়, বরং নবসূত্রে গাঁথার এক নীরব অঙ্গীকার।

চৈত্রসংক্রান্তি পালনের আচার-অনুষ্ঠানে অঞ্চলভেদে বৈচিত্র্য থাকলেও এর মর্মকথা এক-ঐতিহ্যের অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ। যুগে যুগে, কালের পর কাল ধরে বাঙালির জীবনধারা, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে এই দিনটি। একসময় এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আজ তা পরিণত হয়েছে এক সর্বজনীন উৎসবে; ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অংশগ্রহণে এটি পেয়েছে সর্বজনীন স্বীকৃতি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এই উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী উৎসবের মধ্য দিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষকে বরণ করে নেয়, যা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের এক বর্ণাঢ্য প্রকাশ।

গ্রামবাংলার নিসর্গে চৈত্র সংক্রান্তির আবহ যেন আরও গভীর ও প্রাণবন্ত। পুরনো বছরের যাবতীয় দুঃখ, গ্লানি ও ব্যর্থতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। ব্যবসায়িক জীবনে পুরনো হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন করে ‘হালখাতা’ খোলার যে প্রথা, তা যেন নতুন সূচনারই এক প্রতীকী ভাষ্য।

খাদ্য সংস্কৃতিতেও এই দিনের রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। আমিষ বর্জন করে নিরামিষ আহারের যে চিরায়ত রীতি, তা আজও বহমান। কোথাও কোথাও ১৪ প্রকার শাক দিয়ে ‘শাকান্ন’ রান্নার প্রথা যেন প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতারই এক নিবেদন। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে ছাতু খাওয়ার প্রচলনও এই দিনের ঐতিহ্যের অংশ। চৈত্র মাসে রোগবালাই বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে তেতো ও শাকসবজি খাওয়ার যে রীতি, তা কেবল বিশ্বাস নয়-এটি এক প্রাচীন জীবনবোধের প্রতিফলন, যেখানে স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি একসূত্রে গাঁথা।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে চৈত্র সংক্রান্তি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। ব্রতপালন, শিবপূজা এবং নানা বিধান পালনের মধ্য দিয়ে তারা দিনটিকে ধারণ করে। মন্দিরে কিংবা গৃহে পূজা অর্চনার পাশাপাশি সন্ধ্যার অন্ধকারে জ্বলে ওঠা প্রদীপ যেন ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা আগামী দিনের শান্তি ও সমৃদ্ধির এক নিঃশব্দ প্রার্থনা।

সময়ের প্রবাহে চৈত্র সংক্রান্তির রূপ বদলেছে, বিশেষত শহুরে জীবনে। তবুও গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ আজও ম্লান হয়নি। মেলা, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ, পটচিত্র, যাত্রাপালা, লোকসংগীত ও নৃত্যের আয়োজন যেন এই দিনটিকে জীবন্ত করে তোলে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তাদের নিজস্ব উদ্যোগে এই ঐতিহ্যকে ধারণ ও বিস্তারের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে, নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে বাঙালির শেকড়ের গল্প।

এ বছরও চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে দিনটি উদযাপিত হবে নানান আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এরই অংশ বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে লোকশিল্প প্রদর্শনী। প্রায় ৫০ জন যন্ত্রশিল্পীর সম্মিলিত অংশগ্রহণে পরিবেশিত হবে অর্কেস্ট্রা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, যা বয়ে আনবে উৎসবের সম্মিলিত স্পন্দন। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ৩০ জন নৃত্যশিল্পীর পরিবেশনায় ধামাইল নৃত্য যেন ঐতিহ্যের ছন্দে দর্শকদের আবিষ্ট করবে।

অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় পরিবেশিত হবে লোকসংগীত জারিগান, পটগান ও পুঁথিপাঠ, যা বাংলার লোকজ সাহিত্য ও সুরের ঐশ্বর্যকে নতুনভাবে উন্মোচন করবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা এই আয়োজনকে বহুসাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করবে। লোকসাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে মঞ্চস্থ হবে যাত্রাপালা ‘রহিম বাদশা রূপবান কন্যা’, যা দর্শকদের মনে জাগাবে গ্রামীণ জীবনের চিরন্তন রূপকথার আবেশ।

চিফ এডিটর: জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়
সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান পাটোয়ারী
আইন উপদেষ্টা: অ্যাডভোকেট শামসুল আলম পাটোয়ারী
সহকারী সম্পাদক: মোঃ সিদ্দিকুর রহমান (নয়ন)
বার্তা সম্পাদক: রাফিয়া নুসরাত নিদি
যোগাযোগ: +৮৮ ০১৮১৭-৭৫০৯১০, [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: chandpurtribune.com | © ২০২৬ চাঁদপুর ট্রিবউন